জাতপাতের বেড়াজাল ভেঙে কন্যাদের সম্মান, কুলটিতে ৩১ কন্যার পূজায় সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা
মহানবমীতে কুলটি মদদ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ, শিক্ষা-সংস্কার ও আত্মনির্ভরতার মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া পরিবারের মেয়েদের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রয়াস
কুলটি: সমাজে জাতপাতের বিভেদ ও উচ্চ-নীচের মানসিকতা দূর করে সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা দিতে মহানবমীতে এক অনন্য উদ্যোগ নিল কুলটি মদদ ফাউন্ডেশনের কন্যা গুরুকুল। মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর সকালে আয়োজিত কন্যাপূজা অনুষ্ঠানে দলিত ও অতি পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের ৩১ জন বালিকাকে দেবীরূপে পুজো করা হয়। তাঁদের পা ধুইয়ে, তিলক পরিয়ে ও আহারের ব্যবস্থা করে সম্মান জানানো হয়। পাশাপাশি বস্ত্র, উপহার ও প্রসাধন সামগ্রীও তুলে দেওয়া হয় তাঁদের হাতে।

সংস্থার এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য শুধু ধর্মীয় আচার পালন নয়, বরং সমাজে প্রতিটি কন্যার সমান মর্যাদা ও অধিকারের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া। জাতি বা আর্থিক অবস্থার কারণে কোনও শিশুকন্যা যেন শিক্ষা, সম্মান ও উন্নতির সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে কন্যা গুরুকুল।

পুজোর পাশাপাশি সমাজের মানসিকতা বদলানোর উদ্যোগ
কুলটি মদদ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক রবি শঙ্কর চৌবে বলেন, “কন্যাপূজার উদ্দেশ্য শুধু বালিকাদের পুজো করা নয়, সমাজের চিন্তাভাবনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। দলিত ও পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের মেয়েরাও যেন ছোটবেলা থেকেই সম্মান, শিক্ষা, সংস্কার ও আত্মনির্ভরতার সুযোগ পায়। কোনও শিশুর প্রতিভা তার জাতি বা আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে বিচার করা উচিত নয়।”

তিনি আরও জানান, কন্যা গুরুকুলে পড়াশোনার পাশাপাশি কম্পিউটার শিক্ষা, আত্মরক্ষা এবং জীবনমুখী দক্ষতা অর্জনের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সংস্থার লক্ষ্য, এখানকার ছাত্রীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবনে এগিয়ে যাবে এবং ভবিষ্যতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে সমাজ ও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা নেবে। মেয়েরা যেন বড় স্বপ্ন দেখতে পারে, এমনকী বিমান চালানোর মতো ক্ষেত্রেও নিজেদের যোগ্য করে তুলতে পারে, সেই অনুপ্রেরণাও দেওয়া হয়।

শিক্ষা ও আত্মবিশ্বাসই মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার শক্তি
ফাউন্ডেশনের সভাপতি ড. মমতা মিশ্র বলেন, সমাজের অর্ধেক অংশ নারী। তাই ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের শিক্ষা, সংস্কার, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসের বিকাশ ঘটানো জরুরি। প্রতিটি শিশুকন্যার নিজের অধিকার, মর্যাদা ও স্বপ্নের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস থাকা দরকার। জাতপাত, দারিদ্র্য কিংবা পারিবারিক পরিস্থিতি কোনওভাবেই তার ভবিষ্যতের সীমা নির্ধারণ করতে পারে না।
২০০৪ সাল থেকে সমাজসেবায় সক্রিয় ফাউন্ডেশন
কুলটি মদদ ফাউন্ডেশন ২০০৪ সাল থেকে শিল্পাঞ্চলে বিভিন্ন সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত। প্রায় ছয় বছর আগে গুরুপূর্ণিমার দিন প্রতিষ্ঠিত হয় কন্যা গুরুকুল। এখানে ১৪ বছরের কম বয়সি দলিত ও অতি পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের বালিকাদের পড়াশোনার পাশাপাশি ভারতীয় সংস্কার ও মূল্যবোধ, আত্মনির্ভরতা এবং আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বর্তমানে প্রায় ৬০ জন বালিকা এই গুরুকুলের সঙ্গে যুক্ত।
প্রথম বছরে মাত্র ৯ জন কন্যাকে নিয়ে কন্যাপূজার সূচনা হয়েছিল। এ বছর সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১-এ। সংস্থার বক্তব্য, কন্যাদের শুধু আনুষ্ঠানিক সম্মান জানানোই যথেষ্ট নয়; তাঁদের শিক্ষা, দক্ষতা ও আত্মনির্ভরতার মাধ্যমে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার বাস্তব সুযোগও করে দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যাঁরা
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কুলটি মদদ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক রবি শঙ্কর চৌবে, সভাপতি ড. মমতা মিশ্র, সাধারণ সম্পাদক রিঙ্কু চৌবে, কোষাধ্যক্ষ কিরণ প্রসাদ এবং কন্যা গুরুকুলের শিক্ষিকা ঋত্বিকা রাজশ্রী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার কাঁকিনাড়া থেকে আগত শিক্ষিকা উর্মিলা যাদব, ঝাড়খণ্ডের ধানবাদ থেকে আগত সমাজসেবী শশীভূষণ চৌবে এবং কুলটি হিন্দি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা বন্দনা কুমারী। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সমাজসেবিকা বিদ্বন্তী দেবী, রীনা চৌবে-সহ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বহু মানুষ।
কন্যা গুরুকুলের এই উদ্যোগের মাধ্যমে বার্তা দেওয়া হয়েছে, সামাজিক সম্প্রীতি কেবল কথায় নয়, বাস্তবে প্রতিটি কন্যাকে সম্মান, সমান সুযোগ ও শিক্ষার অধিকার দেওয়ার মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। মেয়েদের স্বনির্ভর ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারলেই একটি সমতাভিত্তিক ও প্রগতিশীল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।










